১৯৭১-এর ঈদ: নামাজে গুলি, চোখে পানি - পাহারায় হিন্দু সহযোদ্ধারা, নামাজে মুসলিম মুক্তিযোদ্ধারা
![]() |
| ছবি-(AI) প্রতিকীস্বরুপ |
জাতীয় ডেস্ক,
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সাল শুধু স্বাধীনতার সংগ্রামের বছরই নয়, এটি ছিল অসীম ত্যাগ, রক্ত আর বেদনার সময়। সেই সময়কার ঈদুল ফিতরও ছিল ভিন্ন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক বাশার খান লিখেছেন, “এমন বিবর্ণ, নিরানন্দ-বেদনা বিধুর ঈদ বাঙালির জীবনে আর কখনোই আসেনি।”
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর টানা আট মাসের হত্যাযজ্ঞ, নিপীড়ন ও দমন-পীড়নের মধ্যে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। ঠিক এমন সময় পঞ্জিকার নিয়ম মেনেই আসে ঈদুল ফিতর—কিন্তু আনন্দের বদলে ছিল যুদ্ধের ছায়া।
পাকিস্তানি বাহিনীর বিশেষ সুবিধা
ঐ বছরের ২০ নভেম্বরের ঈদ সামনে রেখে পাকিস্তানের সামরিক সরকার তাদের সেনাদের মনোবল ধরে রাখতে বেতন-ভাতা বাড়ায়। একই সঙ্গে রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনীর সদস্যদেরও বেতন ও রেশন বৃদ্ধি করা হয়। ঈদের দিন তাদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।
রণাঙ্গনে ঈদের কোনো উচ্ছ্বাস ছিল না
অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের বেশিরভাগ ক্যাম্পে ঈদ নিয়ে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস ছিল না। বিভিন্ন স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, অনেক জায়গায় চাঁদরাতেও পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছে। এমন এক যুদ্ধে কুড়িগ্রামে শহীদ হন ৬ নম্বর সেক্টরের কোম্পানি কমান্ডার আবু মঈন মো. আশফাকুস সামাদ।
ঈদের দিনেও শেরপুর, কুষ্টিয়া ও আখাউড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ হয়। অনেক ক্ষেত্রেই মুক্তিবাহিনী বিজয় লাভ করে।
পাহারায় হিন্দু সহযোদ্ধারা, নামাজে মুসলিম মুক্তিযোদ্ধারা
যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু জায়গায় মুক্তিযোদ্ধারা নিজেরাই ঈদের নামাজের আয়োজন করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলম তাঁর স্মৃতিকথা “গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে” বইয়ে লিখেছেন, নিরাপত্তার জন্য দল ভাগ করা হয়েছিল। মুসলিম যোদ্ধারা যখন ঈদের জামাতে দাঁড়াতেন, তখন হিন্দু সহযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে পাহারা দিতেন—যাতে পাকিস্তানি বাহিনীর আকস্মিক হামলা হলে প্রতিরোধ করা যায়।
এই দৃশ্য মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির ঐক্যের একটি শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে আছে।
সীমিত খাবার, তবু ঈদের স্মৃতি
মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক ক্যাম্পে ঈদের দিন সামান্য সেমাই রান্না হয়েছিল। কোথাও কোথাও স্থানীয় মানুষের সহায়তায় মাংস রান্নারও ব্যবস্থা হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্ত তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন, সেদিন অনেকেই খাসির মাংস পেয়েছিলেন মাত্র এক টুকরো করে।
খাবার খেতে খেতে অনেক মুক্তিযোদ্ধার চোখে পানি চলে আসে—কারণ তাদের মনে পড়ে যায় পরিবার, বাবা-মা আর ঘরের ঈদের কথা।
ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নিরানন্দ ঈদ
রণাঙ্গণের বাইরেও মানুষের ঈদ কেটেছিল নিরানন্দে। বড় কোনো আয়োজন ছিল না, অনেকেই ঈদের নামাজেও যাননি। সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীন তাঁর ‘আত্মস্মৃতি’ গ্রন্থে লিখেছেন, ঈদের দিনেও ঢাকার অবস্থা অনেকটা জনশূন্য ছিল। শহরের বড় একটি অংশ নামাজে অংশ নেয়নি, আর অনেক বাড়িতে ঈদের বিশেষ আয়োজনের বদলে সাধারণ ভাত-তরকারি রান্না হয়েছিল।
একই চিত্র দেখা যায় দেশের বিভিন্ন জেলায়। যশোরের বাসিন্দা অলি আহাদ স্মৃতিচারণে বলেন, তখন মানুষের প্রধান চিন্তা ছিল জীবন বাঁচানো—ঈদ উদযাপনের কথা ভাবার সুযোগই ছিল না। সিলেটের বাসিন্দা তাহমিনা বেগমও জানান, ঈদগাহে খুব বেশি মানুষ যাননি, যারা গিয়েছিলেন তারাও নামাজ শেষে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসেন। অনেক ক্ষেত্রে কোলাকুলিও হয়নি।
আতঙ্কে অপেক্ষা করতেন পরিবারের সদস্যরা
ঈদের নামাজ পড়তে যারা বাড়ি থেকে বের হতেন, তারা নিরাপদে ফিরে না আসা পর্যন্ত দুশ্চিন্তায় থাকতেন পরিবারের সদস্যরা—বিশেষ করে নারীরা। কারণ যেকোনো সময় হামলার আশঙ্কা ছিল।
১৯৭১ সালের সেই ঈদ তাই ছিল উৎসবের নয়, বরং সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা আর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় ভরা এক বেদনাময় সময়ের সাক্ষী।




.png)

%20.png)

No comments: