সীতাকুণ্ডের কুমারীকুণ্ডে অস্থায়ী মন্দিরে অগ্নিসংযোগ, নিখোঁজ 'সতীর শিলা' ও ঘট
নিজস্ব প্রতিবেদক,
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বড় কুমিরা এলাকায় দুর্গম পাহাড়ি অরণ্যের ভেতরে অবস্থিত প্রাচীন তীর্থক্ষেত্র কুমারীকুণ্ডে বাঁশ ও খড় দিয়ে নির্মিত একটি অস্থায়ী মন্দির পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া মন্দির থেকে মা সতীর প্রতীক হিসেবে স্থাপিত একটি শিলা ও একটি পূজার ঘট নিখোঁজ হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় ধর্মপ্রাণ সনাতনী ভক্তরা। ঘটনাটি এলাকায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি ‘শিবদাস সংঘ’ নামে একটি সংগঠনের উদ্যোগে কুমারীকুণ্ড তীর্থস্থানের পাশে একটি ছোট অস্থায়ী মন্দির নির্মাণ করা হয়। সেখানে পূজার ঘট ও সতীর প্রতীক হিসেবে একটি শিলা স্থাপন করা হয়েছিল। তবে বৃহস্পতিবার (১৩ মার্চ) স্থানীয় ভক্ত ও এলাকাবাসী সেখানে গিয়ে দেখতে পান, পুরো মন্দিরটি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, মন্দিরের ভেতরে থাকা সতীর শিলা ও ঘটটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা গৌতম মজুমদার জানান, "আমরা গিয়ে দেখি মন্দিরের কিছুই অবশিষ্ট নেই, সব পুড়ে গেছে। সেখানে সতীর ঘট ছিল, শিলা ছিল- কিছুই পাওয়া যায়নি। আশপাশে আগুন লাগানোর স্পষ্ট চিহ্ন দেখেছি। এটা আমাদের কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক।"
প্রাচীন তীর্থক্ষেত্র কুমারীকুণ্ড
কুমারীকুণ্ড সীতাকুণ্ডের বড় কুমিরা এলাকার পাহাড়ি ঝিরিপথ অতিক্রম করে অরণ্যের গভীরে অবস্থিত একটি প্রাচীন তীর্থস্থান। স্থানীয়দের দাবি, তন্ত্রসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে এই স্থানকে 'কন্যাশ্রম শক্তিপীঠ' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভক্ত ও তীর্থযাত্রীদের বিশ্বাস, এটি একান্ন শক্তিপীঠের একটি অংশ।
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, দেবী সতীর দেহখণ্ড বিভিন্ন স্থানে পতিত হয়ে শক্তিপীঠ সৃষ্টি হয়। তন্ত্রগ্রন্থ পীঠনির্ণয়তন্ত্র-এ 'কন্যাশ্রম' নামের একটি পীঠের উল্লেখ রয়েছে, যেখানে দেবীর পৃষ্ঠদেশ পতিত হয়েছিল বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। স্থানীয় ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, কুমারীকুণ্ডই সেই ঐতিহাসিক পীঠস্থান।
তবে 'কন্যাশ্রম শক্তিপীঠ'-এর প্রকৃত অবস্থান নিয়ে পণ্ডিত ও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও, চন্দ্রনাথ মন্দির সংলগ্ন পঞ্চক্রোশ এলাকার মধ্যে কুমারীকুণ্ড শক্তিপীঠের অবস্থান বলেও অনেকের ধারণা।
ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ বছর আগে কুমারীকুণ্ড এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ মন্দির ছিল। বর্তমানে সেই মন্দিরের কাঠামো না থাকলেও পাহাড়ি অরণ্যের ভেতরে এখনও ভগ্ন লাল ইট, প্রাচীন নির্মাণের চিহ্ন ও ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও পর্যাপ্ত সরকারি নজরদারির অভাবে এই তীর্থস্থান বহু বছর ধরেই অবহেলায় পড়ে আছে।
এলাকাবাসী জানান, প্রায় দুই দশক আগে গুপ্তধনের আশায় কিছু লোক ওই এলাকায় খননকাজ চালিয়ে মন্দিরের অবশিষ্টাংশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে। স্বাধীনতার পর একসময় সেখানে একজন মোহন্ত বসবাস করতেন এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান হতো। তাঁর মৃত্যুর পর স্থানটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
কুমারীকুণ্ডকে ঘিরে স্থানীয়দের আরেকটি বিশ্বাস রয়েছে- এখানে একইসঙ্গে উষ্ণ ও শীতল পানির উৎস রয়েছে, যা স্থানটির আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্যকে আরও গভীর করে তুলেছে।
দাবি ও প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা কুমারীকুণ্ডের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও যথাযথ সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, কুমারীকুণ্ডকে সরকারি বা প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে চিহ্নিত করে সুরক্ষা দেওয়া হলে এটি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান ও ধর্মীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। একইসঙ্গে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড ও ধর্মীয় উপকরণ নিখোঁজের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
ধর্মপ্রাণ সনাতনী সমাজের একাংশ মনে করছেন, কুমারীকুণ্ডে অস্থায়ী মন্দিরে আগুন ও সতীর শিলা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা একটি ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্মৃতিচিহ্নের অস্তিত্বের ওপর নতুন করে আঘাত। তাই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শনাক্তকরণ ও কুমারীকুণ্ড সংরক্ষণে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য জানার চেষ্টা চলছে।



.png)

%20.png)

No comments: