শাঁখারীকাঠি গণহত্যা: রক্তাক্ত ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়
বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার শাঁখারীকাঠি আজও বহন করে ১৯৭১ সালের এক ভয়াবহ গণহত্যার স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শুধু প্রাণহানির ঘটনা ছিল না—এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস ও আত্মপরিচয়ের ওপর পরিকল্পিত আঘাত।
ধর্মীয় নিপীড়ন ও জোরপূর্বক ধর্মান্তর
১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে রাজাকার বাহিনী ব্যাপক দমন-পীড়ন চালায়। অভিযোগ রয়েছে, এ.কে.এম ইউসুফ আলীর নির্দেশে গঠিত এই বাহিনী এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে শাঁখারীকাঠি বাজারে প্রায় ২০০ হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয়। বন্দুকের মুখে তাদের নাম পরিবর্তন করানো ছাড়াও ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানার উদ্দেশ্যে জোর করে গো-মাংস খাওয়ানো হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। ঘটনাটি ছিল একটি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টার অংশ বলে মনে করেন গবেষকরা।
৪ নভেম্বরের গণহত্যা
মুক্তিবাহিনীর একটি অভিযানের প্রতিশোধ নিতে নভেম্বরের শুরুতে রাজাকার বাহিনী শাঁখারীকাঠি ও সংলগ্ন আলুকদিয়া গ্রামে হামলা চালায়। ৪ নভেম্বর বিকেলে সশস্ত্র রাজাকাররা তিন দিক থেকে গ্রাম ঘিরে ফেলে এবং প্রায় ৯০ জন হিন্দু পুরুষকে আটক করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের জোড়ায় জোড়ায় বেঁধে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি চালানো হয়। এতে অন্তত ৪২ জন নিহত হন। এ সময় গ্রামজুড়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটও চালানো হয়।
পরবর্তীতে ৬ নভেম্বর স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করেন এবং নিহতদের মরদেহ বিশাখালী নদীর তীরে গণকবরে দাফন করেন। দীর্ঘদিন ভয় ও আতঙ্কের কারণে এ ঘটনার স্মৃতি প্রকাশ্যে আসেনি।
দীর্ঘ নীরবতার পর স্মরণ
দশকের পর দশক ধরে অবহেলিত থাকার পর ২০১০ সালের ৪ নভেম্বর প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে শাঁখারীকাঠি গণহত্যার শহীদদের স্মরণ করা হয়। স্থানীয়দের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচি ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়কে সামনে নিয়ে আসে।
ইতিহাসের দায়
গবেষকদের মতে, শাঁখারীকাঠি গণহত্যা ছিল শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি ছিল ধর্মীয় নিপীড়ন, জোরপূর্বক ধর্মান্তর এবং সাংস্কৃতিক ধ্বংসের একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই ঘটনাটি এখনও তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। তবে স্থানীয়দের দাবি—এ ধরনের গণহত্যার সঠিক স্বীকৃতি ও গবেষণা জরুরি, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারে।
তথ্যসূত্র:
ড. এম এ হাসান, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা ৭১
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (অষ্টম খণ্ড), তথ্য মন্ত্রণালয়
Simon Dring – ডেইলি টেলিগ্রাফ প্রতিবেদন (১৯৭১)
Anthony Mascarenhas – The Rape of Bangladesh




.png)

%20.png)

No comments: