৩০০ বছর পর ভারতে ফিরল চোল সাম্রাজ্যের অমূল্য ঐতিহ্য ‘লাইডেন প্লেটস’
ভারতের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভাণ্ডারে যুক্ত হলো এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রায় ৩০০ বছর পর নেদারল্যান্ডস থেকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে চোল যুগের ঐতিহাসিক ‘আনাইমঙ্গলম তাম্রফলক’, যা ‘লাইডেন প্লেটস’ নামেও পরিচিত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি -র নেদারল্যান্ডস সফরের সময় শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই তাম্রফলক ভারতের হাতে তুলে দেয় ডাচ সরকার।
একাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকের এই তাম্রফলকগুলো দক্ষিণ ভারতের শক্তিশালী চোল সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত। ইতিহাসবিদদের মতে, এগুলো শুধু প্রশাসনিক নথিই নয়, বরং চোল সাম্রাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতারও শক্তিশালী প্রমাণ।
কী আছে এই তাম্রফলকে?
আনাইমঙ্গলম তাম্রফলক মোট ২১টি বৃহৎ তামার পাত নিয়ে গঠিত, যা একটি বিশাল ব্রোঞ্জের আংটির মাধ্যমে একত্রে বাঁধা। প্রায় ৩০ কেজি ওজনের এই সেটে সম্রাট প্রথম রাজেন্দ্র চোলের রাজকীয় সীলমোহর ও চোল বংশের প্রতীকী বাঘের চিহ্ন খোদাই করা রয়েছে।
দ্বিভাষিক এই শিলালিপির প্রথম অংশ সংস্কৃতে রচিত, যেখানে চোল বংশের বিস্তারিত বংশতালিকা ও পৌরাণিক সংযোগ তুলে ধরা হয়েছে। অপরদিকে অধিকাংশ ফলক তামিল ভাষায় লেখা, যেখানে প্রশাসনিক কাঠামো, জমি অনুদান, কর অব্যাহতি, সেচব্যবস্থা এবং স্থানীয় শাসন পদ্ধতির বিস্তারিত বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে।
ফলকগুলোতে উল্লেখ আছে, প্রথম রাজরাজা চোলের শাসনের ২১তম বর্ষে নাগাপত্তনমের নিকটবর্তী আনাইমঙ্গলম গ্রাম এবং আশপাশের জমি ‘চুলমণিবর্মা বিহার’-কে দান করা হয়েছিল।
ইতিহাস অনুযায়ী, এই বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করেছিলেন শ্রীবিজয় সাম্রাজ্যের শাসক শ্রী মারা বিজয়োত্তুঙ্গবর্মণ। বর্তমান ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল সেই শ্রীবিজয় সাম্রাজ্য।
ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সামুদ্রিক শক্তির দলিল
ঐতিহাসিকদের মতে, এই তাম্রফলক চোল সাম্রাজ্যের অসাধারণ সামুদ্রিক ক্ষমতা এবং ভারত মহাসাগরজুড়ে বিস্তৃত বাণিজ্য নেটওয়ার্কের প্রমাণ বহন করে। একইসঙ্গে এটি দেখায়, একজন হিন্দু সম্রাট কীভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক শাসকের প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানকে জমি দান ও প্রশাসনিক সহায়তা দিয়েছিলেন।
ফলকগুলোতে জমির সীমানা নির্ধারণ, করমুক্ত সুবিধা, সেচব্যবস্থার দায়িত্ব এবং স্থানীয় প্রশাসনিক নিয়মাবলির বিস্তারিত বিবরণও লিপিবদ্ধ রয়েছে।
কীভাবে পৌঁছেছিল নেদারল্যান্ডসে?
ধারণা করা হয়, অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে করমণ্ডল উপকূলে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কার্যক্রম চলাকালীন সময়েই এই তাম্রফলক ভারত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে এক ডাচ ধর্মপ্রচারকের ব্যক্তিগত সংগ্রহে এগুলো স্থান পায় এবং অবশেষে ১৮৬২ সালের দিকে নেদারল্যান্ডসের লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত সরকার, ডাচ প্রশাসন এবং লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক নিদর্শন ফেরত আনার প্রক্রিয়া গতি পায়।
সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে ভারতের বড় সাফল্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইডেন প্লেটসের প্রত্যাবর্তন শুধু একটি প্রত্নসম্পদ ফেরত পাওয়া নয়; এটি ঔপনিবেশিক আমলে হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের প্রতীকও। চোল প্রশাসন, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক যোগাযোগ বোঝার ক্ষেত্রে এই তাম্রফলক অমূল্য প্রাথমিক উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের চলমান প্রচেষ্টায় এই প্রত্যাবর্তনকে একটি বড় কূটনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।



.png)

%20.png)

No comments: