রাশিয়ায় মুসলিম ধর্মীয় নেতা ও আলেমদের গ্রেপ্তার
রাশিয়ায় চলতি বছরের মে মাসে একাধিক মুসলিম ধর্মীয় নেতা, আলেম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিকে আটক করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে এ বিষয়ে সীমিত প্রচার দেখা গেছে। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিষয়টি নিয়ে নানা বিশ্লেষণ সামনে এসেছে।
বিবিসি মনিটরিংয়ের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসে অন্তত আটজন মুসলিম আলেম ও কমিউনিটি প্রতিনিধিকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে কারেলিয়ার সাবেক মুফতি উইসাম বার্দভিল, ধর্মীয় নেতা আখমাদ তাঙ্গিয়েভ, মর্দোভিয়া প্রজাতন্ত্রের মুফতি রয়াল আসেনভসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম সংগঠনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা রয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে পুলিশের নির্দেশ অমান্য করা, ঘুষ দাবি এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার মতো অভিযোগ আনা হয়েছে।
রুশ তদন্তকারী সংস্থা ও কিছু গণমাধ্যমের দাবি, কয়েকজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, রাশিয়া ২০০৩ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। তবে অভিযুক্তদের আইনজীবী ও সমর্থকদের একটি অংশ এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন।
এদিকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় রাশিয়ার উগ্র-জাতীয়তাবাদী ও ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্যে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, এই পদক্ষেপ দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকের মতে, সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো রাশিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি নজরদারি ও চাপের ইঙ্গিত বহন করছে।
বিতর্ক আরও তীব্র হয় যখন রাশিয়ার স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস (ডিইউএম)-এর প্রথম ডেপুটি চেয়ারম্যান দামির মুখেতদিনভকে ‘ঘৃণা বা শত্রুতা উসকে দেওয়ার’ অভিযোগে জরিমানা করা হয়। একটি ঐতিহাসিক চিত্রকর্ম তার কার্যালয়ে প্রদর্শনের কারণে এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। সমালোচকদের একাংশ ওই চিত্রকর্মকে ‘রাশিয়া-বিরোধী’ বলে আখ্যা দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার ও তদন্তের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে আবাসিক ভবনে ধর্মীয় সমাবেশ ও জামাতে নামাজ আদায়ের ওপর নতুন বিধিনিষেধ। ডিইউএম প্রধান মুফতি রাভিল গাইনুতদিন এই প্রস্তাবিত আইনের বিরোধিতা করে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে খোলা চিঠি দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, আইনটি মুসলিমদের সাংবিধানিক ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং সামাজিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
রাশিয়ায় বর্তমানে দুই কোটিরও বেশি মুসলিম বাস করে, যা ইউরোপের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যাগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ধরেই ক্রেমলিন মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশটিতে জাতীয়তাবাদী ও অভিবাসীবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শুধু কয়েকজন ধর্মীয় নেতার গ্রেপ্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাশিয়ায় ধর্মীয় স্বাধীনতা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যে চলমান টানাপোড়েনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।




.png)

%20.png)
No comments: