দুই বাংলায় ভিন্ন নববর্ষের তারিখ: ইতিহাস, বিজ্ঞান নাকি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত?
নাক্ষত্রিক পঞ্জিকা বনাম সংশোধিত ক্যালেন্ডার—কেন আলাদা দিনে পালিত হয় বাংলা নববর্ষ
সংবাদ প্রতিবেদন:
বাংলা নববর্ষ উদযাপন বাঙালির অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তবে এক বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো—একই ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাংলা নববর্ষ ভিন্ন তারিখে পালিত হয়। এই বিভাজনের পেছনে রয়েছে ইতিহাস, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং প্রশাসনিক সংস্কারের জটিল সমন্বয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলা সনের প্রবর্তন নিয়ে মতভেদ থাকলেও অনেক গবেষক গৌড়ের প্রাচীন শাসক শশাঙঙ্ক -এর সময়কেই এর সূচনা পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করেন। পরবর্তীতে মুঘল সম্রাট আকবর কৃষি ও রাজস্ব ব্যবস্থার সুবিধার্থে বাংলা সনের ব্যবহারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। তাঁর আমলে চান্দ্রভিত্তিক হিজরি সনের সঙ্গে কৃষি মৌসুমের অসামঞ্জস্য দূর করতে সৌরভিত্তিক গণনার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রথাগত বাংলা পঞ্জিকা মূলত ‘সূর্য সিদ্ধান্ত’ নির্ভর, যেখানে সূর্যের রাশিচক্রে অবস্থান অনুযায়ী মাস নির্ধারণ করা হয়। এই পদ্ধতিতে বছরের দৈর্ঘ্য ও মাসের দিনসংখ্যা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত হওয়ায় তা প্রাকৃতিক গতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে এখনো এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় এবং নববর্ষ ১৪ বা ১৫ এপ্রিলের মধ্যে পরিবর্তিত হতে পারে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে বাংলা পঞ্জিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয় বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে। ১৯৬৩ সালে মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ -এর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি পঞ্জিকা সংস্কারের প্রস্তাব দেয়। ১৯৬৬ সালে প্রস্তাবিত এই সংস্কারে মাসগুলোর দিনসংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়—প্রথম পাঁচ মাস ৩১ দিন এবং পরবর্তী মাসগুলো ৩০ দিন।
এই সংস্কারের মূল লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক ও দৈনন্দিন ব্যবহারে সহজতা আনা। কারণ প্রাচীন পঞ্জিকায় মাসভেদে দিনসংখ্যা পরিবর্তিত হওয়ায় সরকারি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হতো। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সরকার আরও একটি সংশোধন আনে, যাতে জাতীয় দিবসগুলো নির্দিষ্ট ইংরেজি তারিখের সঙ্গে স্থায়ীভাবে মিলিয়ে নেওয়া যায়।
ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিলই পহেলা বৈশাখ পালিত হয়, যেখানে পশ্চিমবঙ্গে তা সূর্যের অবস্থান অনুযায়ী একদিন এদিক-সেদিক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভিন্নতার মূল কারণ হলো—একদিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি, অন্যদিকে প্রশাসনিক সুবিধাভিত্তিক আধুনিক ক্যালেন্ডার। এর ফলে একই সাংস্কৃতিক উৎসব হলেও তারিখে দেখা যায় পার্থক্য।
তবে এই বিভাজন নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। অনেকের মতে, এটি বাঙালির ঐতিহ্যগত অভিন্নতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আবার অন্যদের মতে, আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি নির্দিষ্ট ও সহজ ক্যালেন্ডার অপরিহার্য।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রযুক্তি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের উন্নতির এই সময়ে দুই বাংলার মধ্যে সমন্বিত একটি পঞ্জিকা প্রণয়ন সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন নীতিনির্ধারক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সম্মিলিত উদ্যোগ।
একই আকাশ, একই সূর্য ও একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক হওয়া সত্ত্বেও নববর্ষ উদযাপনের তারিখে এই পার্থক্য এখনো বাঙালির সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেছে।



.png)

%20.png)

No comments: