রোকেয়া হলের ফুটপাতে ৪০ বছর: জুতা সেলাইয়ে জীবন দাসের জীবনসংগ্রাম
স্টাফ রিপোর্টার,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলসংলগ্ন ফুটপাত—চার দশক ধরে এই ছোট্ট জায়গাটিই জীবন দাসের কর্মক্ষেত্র, জীবিকার ভরসা এবং জীবনের সাক্ষী। ১৯৮৫ সাল থেকে একই স্থানে বসে জুতা সেলাই, পলিশ এবং ব্যাগ মেরামতের কাজ করে আসছেন তিনি। সময়ের সঙ্গে বদলেছে সম্বোধন—‘দাদু’ থেকে ‘জীবনদা’, আর এখন শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ‘মামা’।
১৯৬১ সালে জন্ম নেওয়া জীবন দাস বর্তমানে ঢাকার লালবাগে পরিবারসহ বসবাস করেন। স্ত্রী মালতী রানি, দুই ছেলে, পুত্রবধূ এবং দুই নাতনিকে নিয়ে তাঁর সংসার। জীবনের শুরুতেই পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয় তাঁকে। তখন দিনে আয় হতো মাত্র ৩০–৩২ টাকা। সেই সীমিত আয়ের মধ্যেই দুই ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছেন তিনি।
জীবন দাস জানান, সেই সময়ে ২০–২৫ টাকায় দৈনন্দিন খরচ মিটে যেত। “৫ টাকায় চাল, ১০ টাকায় ইলিশ মাছ কিনে খাইতে পারতাম,”—স্মৃতিচারণ করেন তিনি।
বর্তমানে তাঁর আয়ের বড় উৎস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাস খোলা থাকলে দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সেই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। “৫০০ টাকার চাল-ডাল কিনলে মাছ আর কেনা যায় না। এভাবেই হিসাব মেলাতে হয়,” বলেন তিনি।
একসময় নিজ হাতে তৈরি জুতা বিক্রিও করতেন জীবন দাস। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানের পর সেই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আয়ের পথ আরও সংকুচিত হয়েছে।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় দীর্ঘ ১৮ মাস কর্মহীন ছিলেন তিনি। সেই কঠিন সময়ে সংসার চালাতে স্ত্রীর গয়না বিক্রি করতে হয়েছে। “এক ভরি স্বর্ণ বিক্রি করে চলেছি। উপায় ছিল না, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছিল,”—বলছিলেন জীবন দাস।
অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হওয়ার কথা ভাবেননি কেন—এ প্রশ্নের জবাবে তাঁর সোজাসাপ্টা উত্তর, “অন্য কাজ শিখিনি, জানিও না।”
তবে শিক্ষা নিয়ে তিনি ছিলেন সচেতন। বড় ছেলে জনি দাসকে আর্থিক সংকটের কারণে মাধ্যমিকের পর পড়াতে না পারলেও ছোট ছেলে রকি দাস ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি টিউশন করানোর পাশাপাশি আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে সহায়ক হিসেবে কাজ করছেন।
চার দশকের পথচলায় অনেক ঘটনার সাক্ষী জীবন দাস। এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনার স্মৃতি তাঁর কাছে জীবন্ত। “এরশাদ সাহেবের সময়ও আমি এইখানে ছিলাম, বাগদাদের যুদ্ধের সময়ও,”—বললেন তিনি।
দিন শুরু করেন সকাল ৯টায়, শেষ করেন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। তবে দিনের শেষে তাঁর আসল আনন্দের জায়গা পরিবার, বিশেষ করে দুই নাতনি—পল্লবী ও সায়ন্তিকা। “দোকান বন্ধ করলে নাতনিদের ছাড়া আর ভালো লাগে না। এখন আমার দুনিয়া ওদের নিয়েই,”—কথায় ফুটে ওঠে জীবনের আসল প্রাপ্তি।



.png)

%20.png)

No comments: