Top Ad unit 728 × 90

আপনার বিজ্ঞাপনটি দিতে ইমেইল করুন - worldhindutimesbd@gmail.com

শিরোনাম

{getPosts} $results={6} $label={recent}

“রাজাকারদের পৈশাচিকতা: গুলি শেষে জীবিতদেরও গলা কেটে হত্যা”


অনলাইন ডেস্ক: ১৯৭১ সালের ২১ মে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার শান্ত-নিরিবিলি গ্রাম ডাকরা পরিণত হয়েছিল এক ভয়াবহ মৃত্যুকূপে। সেদিন রাজাকার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান অন্তত ৬০০ নিরীহ হিন্দু শরণার্থী। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, অনেককে ব্রাশফায়ারের পরও জীবিত অবস্থায় কালী মন্দিরের সামনে এনে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটি রাজাকারদের হাতে সংঘটিত সবচেয়ে বড় গণহত্যাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।


ডাকরা গ্রামের শতবর্ষী কালী মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল কয়েকটি ব্রাহ্মণ পরিবারের বসতি। মন্দিরের ধর্মগুরু বিনোদ বিহারী চক্রবর্তী, যিনি স্থানীয়ভাবে “নোয়াকর্তা” নামে পরিচিত ছিলেন, তার অসংখ্য ভক্ত ছিল পুরো অঞ্চলে।


১৯৭১ সালের মে মাসে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন বাড়তে থাকলে অনেকেই ভারত যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তবে স্থানীয় মুসলিম লীগ সমর্থক ও শান্তি কমিটির সদস্যরা নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে তাদের দেশত্যাগ না করতে বলেন। পরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ২১ মে সুন্দরবন হয়ে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বহু হিন্দু পরিবার ও ভক্ত। খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের এলাকা ছাড়াও দূরবর্তী অঞ্চল থেকে হাজার হাজার শরণার্থী ডাকরায় জড়ো হন।


২০ মে রাতের মধ্যেই ডাকরা কালী মন্দির এলাকা শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয়। মোংলা নদী, মাদারতলা নদী ও কুমারখালী খালের তীরে শতাধিক নৌকায় অবস্থান নেয় মানুষ। সেসময় সেখানে প্রায় সাড়ে চার হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও ভক্ত উপস্থিত ছিলেন।


স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্যরা বিষয়টি রাজাকার কমান্ডার রজ্জব আলী ফকিরকে জানালে গণহত্যার পরিকল্পনা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বৃহত্তর খুলনার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ও জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন নেতা এ কে এম ইউসুফের নির্দেশেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল।


২১ মে দুপুরে দুটি বড় নৌকায় করে রাজাকার বাহিনী ডাকরায় প্রবেশ করে। নদী ও খালে অপেক্ষমাণ শরণার্থীদের নৌকায় ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এরপর গ্রামে প্রবেশ করে নারী ও পুরুষদের আলাদা করা হয়। পুরুষদের লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়।


প্রত্যক্ষদর্শী অতীন্দ্রনাথ হালদার দুলাল বলেন, রাজাকাররা চলে যাওয়ার পর তিনি কালী মন্দিরের সামনে শুধু লাশ আর লাশ দেখতে পান। তার ভাষ্যমতে, গুলিবিদ্ধ হয়েও যারা বেঁচে ছিলেন, তাদের ধরে এনে আকিজ উদ্দিন ও মজিদ কসাই গলা কেটে হত্যা করে।


আরেক প্রত্যক্ষদর্শী শিশির কুমার বিশ্বাস জানান, তিনি চার চাচাকে হারিয়েছিলেন ওই গণহত্যায়। তিনি বলেন, “চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ পড়ে ছিল। রক্তে মাটি ভেসে যাচ্ছিল। যেদিকে পা দিচ্ছিলাম, সেখানেই লাশ।”


প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা এই হত্যাযজ্ঞে অন্তত ৬০০ মানুষ নিহত হন বলে বিভিন্ন গবেষণা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। অনেকের মতে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি ছিল। গণহত্যার পর হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় রাজাকাররা। কয়েকজন তরুণীকেও জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।


গবেষক বিষ্ণুপদ বাগচী, যিনি “ডাকরা গণহত্যা” নামে একটি গবেষণাগ্রন্থ রচনা করেছেন, জানান যে তিনি ১১১ জন শহীদের নাম শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন, যদিও প্রকৃত সংখ্যা ছয় শতাধিক বলে মনে করা হয়। তৎকালীন স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, অসংখ্য লাশ নদীর স্রোতে ভেসে গিয়েছিল।


মুক্তিযুদ্ধের পর সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে রাজাকার কমান্ডার রজ্জব আলী ফকির আত্মহত্যা করেন। অভিযুক্ত আকিজ উদ্দিন ও মজিদ কসাইও পরে মুক্তি পেয়ে যায়।


ডাকরা গণহত্যা আজও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায়। এই হত্যাযজ্ঞ শুধু নিরীহ মানুষের প্রাণই কেড়ে নেয়নি, বরং মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত এক জঘন্য অপরাধ হিসেবে ইতিহাসে স্থায়ী দাগ রেখে গেছে।

No comments:

অননুমোদিতভাবে কোনও বিষয়বস্তু অনুলিপি করা বা ব্যবহার করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ World Hindu Times All Right Reseved |

Contact Form

Name

Email *

Message *

Theme images by i-bob. Powered by Blogger.