বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ড. অরুণ কুমার বসাক: গবেষণায় অনন্য, নিজ দেশেই অবহেলার শিকার
বাংলাদেশের বিজ্ঞান অঙ্গনে যে কজন ব্যক্তি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার বসাক। পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান ও নিউক্লীয় মিথস্ক্রিয়া বিষয়ে তার গবেষণা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। অথচ জীবনের শেষপ্রান্তে এসে এই খ্যাতিমান বিজ্ঞানীকেই নিজ দেশে ভোগ করতে হচ্ছে অবহেলা, হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতা।
১৯৪১ সালের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির পাবনা শহরের রাধানগরে জন্মগ্রহণ করেন ড. অরুণ কুমার বসাক। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। ১৯৫৭ সালে পাবনার আরএম একাডেমি থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। পরে রাজশাহী কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স সম্পন্ন করে ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ওই বছরই তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন।
মেধার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলেও ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে বিদেশযাত্রার সুযোগ হারান। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য যান। সেখানে নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালনা করেন এবং ১৯৭৫ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ড. বসাকের গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র ছিল টেনসর পোলারাইজড ডিউটেরন এবং পোলারাইজড হিলিয়াম-৩ রশ্মি নিয়ে কাজ, যা সে সময় বিশ্বে অত্যন্ত বিরল ও উচ্চমানের গবেষণা হিসেবে বিবেচিত হয়। তার আন্তর্জাতিক জার্নালে ৮৮টির বেশি গবেষণাপত্র এবং জাতীয় জার্নালে একাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তীতে তার গবেষণার সংখ্যা ১৩৯ ছাড়িয়ে যায় বলে জানা যায়।
তিনি ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ইতালির ত্রিয়েস্তে অবস্থিত আবদুস সালাম আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান কেন্দ্রের (ICTP) সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো, সাউদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং স্কলার এবং মার্কিন ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন অর্থায়িত গবেষণা প্রকল্পে বাংলাদেশের প্রধান গবেষক হিসেবেও কাজ করেছেন।
বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার বিস্তারেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষক এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তরাঞ্চলের প্রথম কম্পিউটার সেন্টার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হন এবং ২০০৩ সালে বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি স্বর্ণপদক লাভ করেন। এছাড়া ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্স (লন্ডন)-এর ফেলোশিপসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন।
তবে এত কৃতিত্বের পরও জীবনের শেষ সময়ে এসে তাকে এক দুঃখজনক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজশাহীতে তার স্ত্রীর রেখে যাওয়া বসতবাড়ির একটি অংশ দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর ধরে স্থানীয় একটি ওয়াকফ এস্টেটের তত্ত্বাবধায়ক দখল করে রেখেছে। জমি উদ্ধারের জন্য তিনি রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) থেকে আদালত পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হলেও এখনও পুরোপুরি ন্যায়বিচার পাননি। এমনকি হাইকোর্ট তার পক্ষে রায় দেওয়ার পরও বাস্তবে তিনি জমির দখল ফিরে পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে ড. বসাক আক্ষেপ করে বলেন, “নিজের বাড়িতেই আজ আমি অনিরাপদ বোধ করছি। সবার দুয়ারে দুয়ারে গিয়েছি, কেউ সাহায্য করেনি।”
দেশের জন্য জীবনভর গবেষণা করে যাওয়া একজন বিজ্ঞানীর এমন পরিণতি নিয়ে সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, রাষ্ট্র ও সমাজ যদি গুণীজনদের যথাযথ সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহ হারাবে।
বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করা এই বিজ্ঞানীর অবদান যেমন স্মরণীয়, তেমনি তার বর্তমান পরিস্থিতিও দেশের জন্য এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।



.png)

%20.png)

No comments: