নাম বদল, পরিচয় সংকট ও রাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে উদ্বিগ্ন ম্রো সম্প্রদায়
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আন্তর্জাতিক ও পার্বত্য ডেস্ক,
বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে দারিদ্র্য, শিক্ষা সংকট এবং রাষ্ট্রীয় সেবার অনুপস্থিতির সুযোগে আদিবাসী শিশুদের একটি অংশকে মাদ্রাসামুখী করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে এবার সামনে এসেছে আরও গুরুতর দাবি: মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর নীরবে বদলে দেওয়া হচ্ছে শিশুদের নাম, ধর্মীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক চিহ্ন।
থানচির প্রত্যন্ত মেনরুয়া পাড়ার বাসিন্দা মাঙ্গিয়া ম্রো বলেন, তার ১৩ বছরের ছেলে ল্যাংরাও ম্রোকে চার মাস আগে একটি মাদ্রাসায় পাঠানো হয়েছিল শুধুমাত্র পড়াশোনার জন্য। কিন্তু মার্চে বাড়ি ফিরে ছেলেটি আর আগের পরিচয়ে ছিল না।
“ওরা ওর নাম বদলে দিয়েছে। ল্যাংরাও থেকে এখন ওর নাম আমির উদ্দিন,” বলেন তিনি।
স্থানীয় অভিভাবক, আদিবাসী নেতৃবৃন্দ এবং অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, বান্দরবানের বিভিন্ন ইসলামিক সেমিনারিতে আদিবাসী শিশুদের ধীরে ধীরে ধর্মীয় রূপান্তরের মধ্যে নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ম্রো সম্প্রদায়ের শিশুরা এই প্রক্রিয়ার শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২২ শিশুর ধর্মান্তরের তথ্য শনাক্ত
স্থানীয় সূত্র, অভিভাবক, গ্রামপ্রধান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও বিশ্লেষণ করে অন্তত ২২ জন ম্রো শিশুর ধর্মান্তরের তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, আদিবাসী কিশোরদের পাঞ্জাবি-টুপি পরিয়ে ইসলামিক স্লোগান দিতে এবং নামাজ আদায় করতে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে বান্দরবানের আলীকদম, থানচি ও চিম্বুক এলাকার কয়েকটি প্রতিষ্ঠান—ইকরা তাহসিনুল কুরআন মাদ্রাসা, চাইখ্যাং মাদ্রাসা এবং ১১ কিলো মডেল একাডেমি।
চট্টগ্রাম পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য কমলাই ম্রো বলেন,
“মাদ্রাসায় নেওয়ার পরই তাদের নাম বদলে দেওয়া হয়। পাঞ্জাবি ও টুপি পরানো হয়। গত কয়েক বছর ধরে বিষয়টি ঘটছে।”
শিক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলাম, ধর্ম বদলানোর জন্য নয়
খোরচিয়ং পাড়ার বাসিন্দা টুম্প্রে ম্রো বলেন, চরম দারিদ্র্যের কারণে সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন।
“আমাদের কাছে খাবার কেনার টাকাও থাকে না। তাই যেখানে বিনা খরচে থাকা-খাওয়া আর পড়াশোনার সুযোগ আছে, সেখানে সন্তানদের পাঠাই,” বলেন তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক গ্রামে সরকারি বিদ্যালয় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে। হাসপাতালে পৌঁছাতে লাগে ৩০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ায় মাদ্রাসাগুলোই হয়ে উঠছে একমাত্র শিক্ষাকেন্দ্র।
ক্রং লিউ নামের এক শিশুর বাবা কাংপং ম্রো বলেন,
“আমরা চেয়েছিলাম সন্তানরা শিক্ষিত হোক। কিন্তু নাম বদলে ফেলবে, সেটা কখনো বলিনি। এখন আমার ছেলের নাম সাইফুল ইসলাম।”
মাদ্রাসাগুলোর দাবি: ‘সহজ উচ্চারণের জন্য নাম পরিবর্তন’
অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।
ইকরা তাহসিনুল কুরআনের শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন,
“ল্যাংরাও বা মাম্পের মতো নাম উচ্চারণ করা অন্য শিশুদের জন্য কঠিন। তাই সহজ নাম রাখা হয়।”
তবে অধিকারকর্মীরা বলছেন, এটি কেবল নাম পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলার একটি প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সারা হুসাইন বলেন,
“অভিভাবকরা শিক্ষার জন্য সম্মতি দিলেও ধর্মান্তরের জন্য নাও দিতে পারেন। সম্মতি ছাড়া ধর্মান্তর ঘটলে তা আইনের দৃষ্টিতে প্রতারণা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।”
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, মাদ্রাসা বোর্ড এসব প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের তদারকি করছে।
সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের সংকট
ম্রো সম্প্রদায় বান্দরবানের দ্বিতীয় বৃহত্তম আদিবাসী জনগোষ্ঠী। তারা ‘ক্রম’ ধর্ম অনুসরণ করে, যা তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, শিশুদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বদলে গেলে ভবিষ্যতে পুরো জনগোষ্ঠী অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।
কমলাই ম্রো বলেন,
“বম সম্প্রদায়ের বড় অংশ ইতোমধ্যে খ্রিস্টান হয়েছে। এখন যদি ম্রো শিশুদেরও একইভাবে ধর্মান্তর করা হয়, তাহলে আমাদের অস্তিত্বই হুমকিতে পড়বে।”
সাংবাদিক ও গবেষক সাইদিয়া গুলরুখ বলেন,
“কোনো জাতিগোষ্ঠীকে ধ্বংস করতে সবসময় অস্ত্র লাগে না। জোরপূর্বক বা প্রলোভনের মাধ্যমে ধর্মান্তরও সাংস্কৃতিক নির্মূলের একটি রূপ হতে পারে।”
জনসংখ্যায় পরিবর্তন, বাড়ছে উদ্বেগ
২০১১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বান্দরবানে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৫৬ হাজার বেড়েছে। একই সময়ে আদিবাসী ও অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর অনুপাত তুলনামূলকভাবে স্থির থেকেছে।
গবেষকরা বলছেন, এই পরিবর্তনের পেছনে উচ্চ জন্মহার ছাড়াও সমতল অঞ্চল থেকে অভিবাসন, রাষ্ট্র-সমর্থিত বসতি স্থাপন এবং ধর্মীয় প্রভাব বিস্তারের ভূমিকা রয়েছে।
রাষ্ট্র কী করছে?
নতুন সরকার পার্বত্য অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন এখনো স্পষ্ট নয়।
চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেছেন, অভিযোগ তদন্ত করা হবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দাদের প্রশ্ন—যেখানে এখনও বিদ্যুৎ, হাসপাতাল, বিদ্যালয় ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নেই, সেখানে শুধুমাত্র তদন্ত দিয়ে কি আদিবাসী শিশুদের সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা সম্ভব?
ম্রো পাড়াগুলোতে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্ক একটাই—
দারিদ্র্যের বিনিময়ে হারিয়ে যাচ্ছে কি তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিজস্ব পরিচয়?



.png)

%20.png)

No comments: