শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানে বসবাসকারী নানা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্বীকৃতি ও সমঅধিকারের দাবি"
সত্যজিৎ দাস:
যে দিন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হব,সে দিন হারমোনি ফেস্টিভ্যাল উপভোগ করব। যারা সরকারি সুযোগ-সুবিধা পায় তারা এগিয়ে যাচ্ছে,আর যারা পায় না তারা পিছিয়ে পড়ছে। এই বৈষম্য কেন ভাইয়ের মাঝে? সবাই তো একই জায়গা থেকে এসেছে,খালি হাতে এসেছে।”
কথাগুলো বলছিলেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া চা বাগানের বাসিন্দা বিষ্ণু হাজরা। পেশায় চা-শ্রমিক ও খণ্ডকালীন ঝালমুড়ি বিক্রেতা হলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতির দাবিতে নীরবভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
গত ১৭ জুন শ্রীমঙ্গলে প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে স্মারক হিসেবে একটি গাছ রোপণ করেন বিষ্ণু হাজরা। তবে তাঁর এই বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়,বরং নিজ সম্প্রদায়সহ উপেক্ষিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষারও প্রতীক।
স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই বৃক্ষপ্রেমী ১৯৯৭ সাল থেকে নিজের উপার্জনের অর্থে হাজার হাজার গাছ রোপণ ও পরিচর্যা করে আসছেন। প্রায় তিন দশক ধরে তাঁর এই ব্যক্তিগত উদ্যোগ শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকায় সবুজায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৫০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী স্বীকৃত। ২০১৯ সালের ২৩ মার্চ প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ তালিকা সম্প্রসারিত করা হয়।
সরকারি নথি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের তথ্য অনুযায়ী,শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ২৬ থেকে ২৭টি গেজেটভুক্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস রয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের হারমোনি ফেস্টিভ্যালসহ বিভিন্ন আয়োজনে এসব জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি,ঐতিহ্য ও জীবনধারা তুলে ধরা হয়।
তবে আদিবাসী সমন্বয়ক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের দাবি,বাস্তবে মৌলভীবাজার জেলায় ৯০টিরও বেশি ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠী ও উপ-সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে,যার বড় অংশই শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি এলাকা ও শতবর্ষী চা-বাগানগুলোতে বসবাস করে।
তাদের মতে,সরকারি আদমশুমারি ও বিভিন্ন নথিতে অনেক ছোট জাতিগোষ্ঠীকে আলাদাভাবে চিহ্নিত না করে বৃহত্তর কোনো জনগোষ্ঠীর অংশ কিংবা ‘চা-জনগোষ্ঠী’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে তাদের স্বতন্ত্র ভাষা,সংস্কৃতি ও পরিচয় অনেকাংশেই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
ব্রিটিশ আমলে ভারতের বিহার,ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, সাঁওতাল পরগনাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিক এনে গড়ে তোলা হয়েছিল শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানগুলো। এসব শ্রমিকের উত্তরসূরিদের মধ্যে বর্তমানে মুন্ডা,সাঁওতাল,ওঁরাও, কন্দ, বাউরি, ভূমিজ, গঞ্জু, রাজোয়াড়, তেলি, মহালি, লোহার, বড়াইকসহ অসংখ্য জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করছেন।
গবেষকদের মতে,শুধু চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেই প্রায় ৭৫ থেকে ৮০টি ভিন্ন ভাষাভাষী ও সাংস্কৃতিক উপ-সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রয়েছে। প্রত্যেকের রয়েছে পৃথক গোত্র,লোকসংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান ও ঐতিহাসিক পরিচয়।
২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী মৌলভীবাজার জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা ৭৩ হাজার ২৮৮ জন। তবে স্থানীয় অধিকারভিত্তিক সংগঠনগুলোর দাবি,প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
বিষ্ণু হাজরার ভাষায়,“ব্রিটিশ আমলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনা চা-শ্রমিকদের ভাষা, উৎসব, রীতিনীতি ও গোত্র আলাদা হলেও অনেক সময় সবাইকে এক নামের নিচে দেখানো হয়। কাগজে হয়তো ২৭ বা ২৮টি সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়, কিন্তু শ্রীমঙ্গলের মাটিতে হাঁটলে ৪০ থেকে ৫০টিরও বেশি বৈচিত্র্যময় জাতিসত্তার অস্তিত্ব চোখে পড়ে।”
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা মনে করেন,দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে হলে মাঠপর্যায়ে বিদ্যমান ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর সঠিক তথ্যভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন জরুরি।
শ্রীমঙ্গলের পাহাড়,টিলা ও চা-বাগানের বিস্তীর্ণ জনপদে বসবাসরত বহু জনগোষ্ঠী এখনও সরকারি স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে। সেই অপেক্ষার প্রতিধ্বনি যেন শোনা যায় বৃক্ষপ্রেমী চা-শ্রমিক বিষ্ণু হাজরার কণ্ঠেও।
গাছ লাগিয়ে প্রকৃতিকে বাঁচানোর পাশাপাশি তিনি তুলে ধরছেন আরেকটি প্রত্যাশা,দেশের বৈচিত্র্যময় সব জাতিসত্তার ন্যায্য স্বীকৃতি ও সমঅধিকারের দাবি।




.png)

%20.png)
No comments: